ব্রেকিং:
রমজানে সিলেটসহ সারাদেশে নতুন সময়সূচিতে চলছে অফিস সিলেটে স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্সের আত্মহত্যা যুবকের! পবিত্র রমজান মাসের মর্যাদা, ইবাদত ও ফজিলত রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় জৈন্তাপুরে বাজার মনিটরিং চুনারুঘাটে দুর্ঘটনায় চাশ্রমিক-সন্তান নিহত অস্ত্রোপচারে দুর্ঘটনার দায় হাসপাতাল ও চিকিৎসকের: স্বাস্থমন্ত্রী হাইতির প্রধানমন্ত্রী হেনরির পদত্যাগ গত ১৫ বছরে দেশের চেহারা বদলে গেছে : এম এ মান্নান এমপি বিএসএমএমইউ’র নতুন উপাচার্য ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক রমজানের প্রথম তারাবিতে সিলেটে মুসল্লিদের ঢল রমজানে আবহাওয়া যেমন থাকবে সিলেটে?
  • শনিবার ১৩ এপ্রিল ২০২৪ ||

  • চৈত্র ৩০ ১৪৩০

  • || ০৩ শাওয়াল ১৪৪৫

সর্বশেষ:
রমজানে সিলেটসহ সারাদেশে নতুন সময়সূচিতে চলছে অফিস সিলেটে স্ত্রীর সঙ্গে ডিভোর্সের আত্মহত্যা যুবকের! পবিত্র রমজান মাসের মর্যাদা, ইবাদত ও ফজিলত রমজানে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় জৈন্তাপুরে বাজার মনিটরিং চুনারুঘাটে দুর্ঘটনায় চাশ্রমিক-সন্তান নিহত অস্ত্রোপচারে দুর্ঘটনার দায় হাসপাতাল ও চিকিৎসকের: স্বাস্থমন্ত্রী হাইতির প্রধানমন্ত্রী হেনরির পদত্যাগ গত ১৫ বছরে দেশের চেহারা বদলে গেছে : এম এ মান্নান এমপি বিএসএমএমইউ’র নতুন উপাচার্য ডা. দীন মোহাম্মদ নূরুল হক রমজানের প্রথম তারাবিতে সিলেটে মুসল্লিদের ঢল রমজানে আবহাওয়া যেমন থাকবে সিলেটে?
১৬১২

জিআই পণ্যে সম্ভাবনাময় সিলেট অঞ্চল : এগিয়ে আসুক সংশ্লিষ্টরা

সম্রাট দেব চৌধুরী

প্রকাশিত: ২১ মার্চ ২০২৪  

সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত আলোচিত একটি প্রসঙ্গ হচ্ছে দেশীয় পণ্যের জি আই স্বীকৃতি। বিশেষত অতি সম্প্রতি ভারত বাংলাদেশের টাঙাইল শাড়িকে নিজস্ব জি আই পণ্য হিসেবে দাবি করলে বিষয়টি জনসম্মুখে আসে । এরপর থেকে বেড়েছে জি আই স্বীকৃতির বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষেরও আগ্রহ। আর সমসাময়িক ভাবেই আমাদের করা অতীতের বেশ কিছু আবেদনের স্বীকৃতিও মিলেছে পরপর। তাই এটাই হয়তো সঠিক সময় যখন আমরা জি আই পণ্য নিয়ে আরো বিশদভাবে ভাবতে পারি ও একটি বিস্তারিত পরিকল্পনা তৈরী করতে পারি। আর সে জায়গাটিতে সম্ভাবনা রয়েছে আমাদের সিলেটের স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যগুলিরও। 

 

বাংলাদেশে এখন “জি আই পণ্য” ও “জি আই স্বীকৃতি” পরিচিত শব্দ হলেও এগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক অর্থ সম্পর্কে অনেকেরই অজানা। মূলত একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল, এর পরিবেশ  এবং ভৌগলিক অবস্থা ইত্যাদি বা তার জনগোষ্ঠীর কোনো অভ্যাস বা সংস্কৃতি ইত্যাদি যদি কোনো  নির্দিষ্ট পণ্য উৎপাদনে ভূমিকা রাখে, তাহলে সেই পণ্য ওই অঞ্চলের জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জিআই হলো ভৌগলিক নির্দেশক চিহ্ন যা কোনো পণ্যের একটি সুনির্দিষ্ট উৎপত্তিস্থলের কারণে এর খ্যাতি বা গুণাবলী নির্দেশ করতে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত জিআইতে উৎপত্তিস্থলের নাম (শহর, অঞ্চল বা দেশ) অন্তর্ভুক্ত থাকে। জিআই (GI) এর পূর্ণরুপ হলো (Geographical indication) ভৌগলিক নির্দেশক। WIPO (world intellectual property organization) হলো  জিআই পণ্যের স্বীকৃতি দানকারী প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সব ধরণের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ণের পর কোনো পণ্যকে জি আই পণ্যের স্বীকৃতি দেয়া হয় , এই স্বীকৃতি আপাতভাবে বিশ্বজনীন ও সর্বসম্মত। 

 

আর তাই কোনো পণ্য জিআই স্বীকৃতি পেলে এর গুরুত্ব বাড়ে, মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। তদুপরি জি আই স্বীকৃতির একটি বাণিজ্যিক গুরুত্বও আছে। জিআইয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো সুনির্দিষ্ট এলাকার পণ্যের প্রসার, এর গুণগত মান বৃদ্ধি এবং নকল রোধ করা। এভাবে মান অক্ষুন্ন হলে পণ্যের বাজার বাড়ে, এলাকার বাইরে এমনকি বিদেশেও রপ্তানিযোগ্য হয়ে ওঠে। আর এ জন্যেই প্রতিটি দেশের প্রতিটি অঞ্চলের সচেতন মানুষ মাত্রেই চায় নিজের অঞ্চলের নিজস্ব পণ্যগুলির আলাদা স্বীকৃতি । কেননা একটি অঞ্চলের পরিচয় হয়ে উঠতে পারে এই পণ্যগুলো, হয়ে উঠতে পারে পর্যটক আগমনের হেতু , সর্বোপরি এই পণ্যগুলো সৃষ্টি করতে পারে নিত্যনতুন বাজার।

 

কথা হলো , আলোচনা যখন জি আই পণ্য নিয়ে , তখন আমরা সিলেটিরা কিন্তু হওয়া উচিত অতিরিক্ত সচেতন। আমাদের আছে সমৃদ্ধ ইতিহাস , বিস্তৃত ভৌগলিক অঞ্চল আর বিচিত্র প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। সিলেট অঞ্চল শুধু বাংলাদেশে নয় সমগ্র বিশ্বেই একটি বৈচিত্র্যময় অঞ্চল হিসেবে নিজের একটি আলাদা স্থানের দাবীদার। ভাষাগত , আবহাওাগত বিভিন্ন বৈচিত্র্য সিলেটের মানুষকে দিয়েছে উদার ও বিস্তীর্ণ সংষ্কৃতি , দিয়েছে স্থানিক বৈচিত্র্য, আর এরই সাথে দিয়েছে নানান বিচিত্র পণ্যের সমাহারও, যা কেবলই সিলেটের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য , যা কেবল পাওা যায় সিলেটেই , যা কেবল তুলে ধরে সিলেটেরই মা , মাটি ও মানুষকে, আর যা বিশ্বের কাছে আলাদা পরিচয়ে পরিচিত করাতে পারে কেবলই সিলেটকে।

 

সিলেটের নিজস্ব পণ্য হিসেবে জি আই স্বীকৃতি পাওয়ার দাবীদার পণ্য আছে অনেক। তার মাঝে উল্লেখযোগ্য কিছু পণ্য হলো – সিলেট অঞ্চলের মণিপুরী শাড়ি, যা মণিপুরী জাতির নিজস্ব বুণন শৈলীর অপরুপ নিদর্শন বয়ে চলে। সিলেটের আনারস যা আকারে ও মিষ্টতায় ভীষণ আলাদা, স্থানীয় ভাবে এটি জলঢুপ নামেও পরিচিত। সিলেটের নিজস্ব স্থানীয় খাদ্যপণ্য ছিকর রয়েছে যেটি মূলত মাটি দিয়ে নির্মিত বিস্কিট বা সন্দেশ বলা চলে যা কেবলমাত্র এই অঞ্চলের মাটি দিয়েই তৈরী হয়। এছাড়াও  রয়েছে খাসিয়া পান , নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের চা পাতা ইত্যাদি। এদের স্বীকৃতির জন্যেও দাবী জানানোর সুযোগ রয়েছে , অবশ্য এসব পণ্যে দাবী জানানোর সুযোগ আছে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেরও।  আরো রয়েছে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ফল সাতকড়া , যা স্থানীয় ভাবে হাতকড়া নামেও পরিচিত, সিলেটিদের গরুর মাংসসহ নানান মাংস রান্না  অসম্পূর্ণই রয়ে যায় যে হাতকড়া ছাড়া। 

 


সিলেটিদের রয়েছে এমনই আরো নানা পণ্য। পোষাকে , খাদ্যে , সিলেট সব সময়ই নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যকে বয়ে চলেছে কয়েক শত বছর ধরে, আর বিগত শতাব্দী জুড়ে সিলেটের এসব ঐতিহ্যবাহী পণ্য প্রবাসী সিলেটিদের হাত ধরে পৌঁছেছে বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে। এমনকি বিভিন্ন দেশের এয়ারপোর্টে সিলেটিদের পণ্য আটকে দেওা আর নিজের দেশের পণ্য নিয়ে যেতে সিলেটিদের নাছোড়বান্দা আচরণের হাস্যরসাত্মক গল্পেরও কিন্তু কমতি নেই। আসলে মা ও মাটির প্রতি সিলেটিদের টানটা এতোই বেশি যে বিশ্বের যেখানেই থাক সিলেটিরা নিজের মাটির ঘ্রাণ নিঃশ্বাসের সাথে  না নিতে পারলে আজও শান্তিতে ঘুমাতে পারে না । আর তাই তারা যেখানেই যায় বয়ে চলে নিজের  মাটির পরিচয়বাহী দ্রব্যাদী , পণ্যসমূহ।

 


আর সেই পণ্য সমূহেরই যখন সুযোগ আছে বাকিদের মত নিজের একটি স্বতন্ত্র পরিচয় পাওয়ার তখন তাদের সেই পরিচয় পাইয়ে দেয়ার দায়িত্বটা কিন্তু আগে নিতে হবে আমাদের সিলেটিদেরই। যদিও সার্বিক ভাবে এসব পণ্যের স্বীকৃতি অর্জনের দায় সারা বাংলারই। কিন্তু স্থানীয় জনগোষ্ঠী হিসেবে আমাদেরই এ দায়িত্ব আগে নিতে হবে।

 


উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালে জামদানি শাড়ী বাংলাদেশের প্রথম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এরপর ক্রমান্বয়ে স্বীকৃতি আদায় করে আরো ২০টি পণ্য। সেগুলো হলো-বাংলাদেশের ইলিশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের খিরসাপাত আম, বিজয়পুরের সাদা মাটি, দিনাজপুর কাটারীভোগ, বাংলাদেশের কালিজিরা, রংপুরের শতরঞ্জি, রাজশাহীর সিল্ক, ঢাকাই মসলিন, রাজশাহী-চাপাইনবাবগঞ্জের ফজলি আম, বাংলাদেশের বাগদা চিংড়ি, বাংলাদেশের শীতল পাটি, বগুড়ার দই, শেরপুরের তুলশীমালা ধান, চাঁপাই নবাবগঞ্জের ল্যাংড়া আম, চাঁপাই নবাবগঞ্জের আশ্বিনা আম, নাটোরের কাঁচাগোল্লা, বাংলাদেশের ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল, টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচম, কুমিল্লার রসমালাই ও কুষ্টিয়ার তিলের খাজা।

 


সাম্প্রতিক সময়ে টাঙাইল শাড়ি নিয়ে ভারতের সাথে যুযুধান সময়েই বাংলাদেশ পরপর অর্জন করে বেশক’টি পণ্যের জি আই স্বীকৃতি। গত ১২ই ফেব্রুয়ারি ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে রংপুরের হাঁড়িভাঙ্গা আম, মৌলভীবাজরের আগর, মুক্তগাছার মন্ডা ও মৌলভীবাজারের আগর আতর এ ৪টিকে জিআই পণ্য হিসেবে অনুমোদন দিয়ে একটি জার্নাল প্রকাশিত হয়। এরপর গত ১৫ ফেব্রুয়ারী ২০২৪ ইংরেজী তারিখে যশোরের খেজুরের গুড়, রাজশাহীর মিষ্টি পান এবং জামালপুরের নকশিকাঁথা, এ তিনটিকে বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে অনুমোদন দিয়ে  জার্নাল প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও নিকট সময়ে জি আই স্বীকৃতি পেয়েছে টাঙ্গাইল শাড়ী, নরসিংদীর অমৃতসাগর কলা ও গোপালগঞ্জের রসগোল্লা। সব মিলিয়ে এখন বাংলাদেশের জি আই পণ্যের সংখ্যা ৩১টি, যা আমাদের সবার জন্যেই অত্যন্ত গর্বের বিষয়। কিন্তু আমাদের সিলেট অঞ্চলের সমৃদ্ধ পণ্যসম্ভারের খুব বেশি পণ্য কিন্তু এখনো স্থান পায়নি এই তালিকায়। বিষয়টি সিলেটবাসী হিসেবে আমাদের মোটেই স্বস্তিতে থাকতে দেয়ার মতো না। 

 

তাই নিজেদের পণ্যকে তুলে ধরতে আমাদের নিজেদেরই সচেতনতা প্রয়োজন সর্বাগ্রে। সিলেটি তরুণ শিক্ষার্থী , সিলেটি গবেষক, সিলেটি স্বেচ্ছাসেবীদের আন্তরিক চেষ্টায় আমাদের পণ্যগুলিও সুযোগ পাবে জি আই তালিকাভুক্তির আবেদনের । সাধারণত এ কাজটি করার দায়িত্ব স্থানীয় জেলা প্রশাসনের হলেও নিজেদের ঐতিহ্যের স্বীকৃতির স্বার্থে আমাদেরই এখন স্বেচ্ছাশ্রম দেয়া প্রয়োজন। সঠিক দাপ্তরিক প্রক্রিয়াদি সম্পন্ন করে জি আই তালিকাভুক্তি আবেদনের জন্যে সুনির্দিষ্ট কিছু ধাপের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। সংগ্রহ করতে হয় নানা তথ্য উপাত্ত । সেগুলোকে সংকলিত করে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে স্বেচ্ছাসেবীরা জমা দিলে স্থানীয় প্রশাসনের কাজও অনেক সহজ হয়। এমনকি আমাদের দেশে এখন পর্যন্ত যেসব পণ্য স্বীকৃতি পেয়েছে তাদের অধিকাংশেরই নেপথ্যের নায়ক কিন্তু  ছিলেন আমাদেরই দেশের কিছু উদ্যমী তরুণ-প্রাণ স্বেচ্ছাসেবী। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও তরুণ শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় প্রচুর ভুমিকা রাখেন নিজস্ব জি আই পণ্যের তথ্য সংগ্রহ ও সংকলনের ব্যাপারে। 

 


সিলেটি পণ্যের স্বীকৃতি আদায়ে স্থানীয় পর্যায়ে সিলেটি তরুণদের ও শিক্ষানুরাগীদেরও তেমন ভুমিকা রাখা এখন কাঙ্খিত। এবং সার্বিক উদ্যোগে , প্রশাসনিক দৃষ্টিপাতে আমরা সিলেটিরাও আশা করতে পারি অচিরেই বাংলাদেশি জি আই পণ্যের তালিকায় আমাদেরও ঐতিহ্যবাহী পণ্যসমুহের নাম দেখা যাবে। যা অত্যন্ত প্রয়োজনও আমাদের পণ্যের বাজারের প্রসার ও ঐতিহ্যের স্বীকৃতি নিশ্চিতে।

 

লেখক: কলামিস্ট ও এক্টিভিস্ট, সিলেট

সিলেট সমাচার
সিলেট সমাচার