• রোববার   ২৬ জুন ২০২২ ||

  • আষাঢ় ১২ ১৪২৯

  • || ২৫ জ্বিলকদ ১৪৪৩

সর্বশেষ:
পদ্মা সেতুতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি বন্যায় সিলেটে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫১ পদ্মা সেতু হয়ে সিঙ্গাপুর থেকে ইউরোপে যাবে ট্রেন পদ্মা সেতু আমাদের আবেগ, বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি: প্রধানমন্ত্রী যে কারণে বিশ্বের অন্য সেতুর চেয়ে আলাদা
২১

বদলি হজ: যেসব কারণে করাতে হয়, কী নিয়ম

সিলেট সমাচার

প্রকাশিত: ২৮ মে ২০২২  

আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে ব্যক্তির ওপর আরোপিত বিধানের নামই ইবাদত। বান্দার ওপর যথাযথভাবে সেই ইবাদত পালন করা জরুরি। কিন্তু কিছু ইবাদত পালনে স্থলাভিষিক্ত বানানো যায়। পবিত্র হজের বিধানের ক্ষেত্রেও অনুরূপ অবকাশ রয়েছে। অক্ষমতার সময় নিজের হজ অন্যের মাধ্যমে করানো যায়। ইসলামের পরিভাষায় একে বদলি হজ বলা হয়। 

বদলি হজ কী?

কোনো ব্যক্তির হজ ফরজ হওয়ার পর তা আদায় করার আগেই মারা যায় কিংবা স্বাস্থ্যগত কারণে হজ সম্পাদনে অক্ষম হন তবে উভয় অবস্থায় অন্যের দ্বারা হজ করানো যায়। আর অন্যের দ্বারা হজ করানোকেই বদলি হজ বলে।

হজরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত জুহায়না গোত্রের এক নারী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে এসে বলল, আমার মা হজের মানত করেছিলেন, কিন্তু তা আদায় করার আগেই তিনি মারা গেছেন। আমি কি তার পক্ষ থেকে হজ করবো? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘হ্যাঁ, তার পক্ষ থেকে তুমি হজ করবে। যদি তার কোনো ঋণ থাকে তবে কি তুমি তার ঋণ পরিশোধ করতে না? সুতরাং আল্লাহর ঋণ পরিশোধ কর। কেননা আল্লাহ তাআলাই পাওনা পাওয়ার সর্বাধিক হকদার।’ (বুখারি)

প্রিয়নবি যেখানে মান্নতের হজ আদায়ের ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন সেখানে ফরজ হজের ব্যাপারটিতো আরো গুরুত্বপূর্ণ।

যেসব কারণে বদলি হজ করাতে হয়-

১. হজ ফরজ হওয়ার পর মৃত্যু।
২. বন্দীত্ব।
৩. জীবনে আরোগ্য হওয়ার আশা নেই এমন অসুস্থ ব্যক্তি।
৪. খোঁড়া হয়ে যাওয়া।
৫. অন্ধত্ব।
৬. এত বৃদ্ধ হওয়া যে, বহনে বসারও ক্ষমতা নেই।
৭. যে সব নারীদের মাহরাম নেই।
৮. কোনো কারণে নিরাপত্তাহীনতা।

হজ পালনে স্থলাভিষিক্ত বানানোর বৈধতা

সকল ইবাদত তিন ধরনের হয়ে থাকে—

১. শারীরিক বা কায়িক ইবাদত; যেমন—নামাজ, রোজা ইত্যাদি। এগুলোর উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তার আনুগত্যের মধ্যে থাকা। এই ইবাদতে সম্পদ ব্যবহৃত হয় না।

২. আর্থিক ইবাদত; যেমন—জাকাত, সদকা ইত্যাদি। এর উদ্দেশ্য হলো অভাবগ্রস্তদের আর্থিক সাহায্য করা।

৩. ওই ইবাদতদ্বয়ের সমষ্টি হলো হজ। এতে তাওয়াফ-সায়ি ইত্যাদিতে রয়েছে বিনয় ও আনুগত্য, অন্যদিকে এতে আল্লাহর রাহে সম্পদ ব্যয় করতে হয়।

প্রথম ধরনের ইবাদতের মধ্যে (নামাজ, রোজা) অন্যকে ইবাদতের স্থলাভিষিক্ত বানানোর সুযোগ নেই; বরং প্রত্যেকে নিজেরটা পালন করতে হয়। কিন্তু দ্বিতীয় ধরনের ইবাদতে (আর্থিক ইবাদত) অন্যকে স্থলাভিষিক্ত বানানোর সুযোগ আছে। তাই সম্পদশালীদের জন্য তাদের জাকাত বা সদকা আদায় করার জন্য অন্য কাউকে স্থলাভিষিক্ত বানানো জায়েজ। তৃতীয় ধরনের ইবাদত হজ। এ ইবাদতেও স্থলাভিষিক্ত বানানোর সুযোগ আছে। তাই কেউ যদি হজ করতে অক্ষম হয়, তখন তার জন্য হজ পালনে কাউকে তার স্থলাভিষিক্ত বানানো ওয়াজিব। (কিতাবুল ফিকহ : ১/১১৬৪, মুয়াল্লিমুল হুজ্জাজ : ২৮১)

বদলি হজ শুদ্ধ হওয়ার শর্তাবলি

এক. বিনিময় দেওয়ার শর্ত না থাকা।

দুই. ব্যয়ভার থাকবে প্রেরণকারীর দায়িত্বে। অবশ্য যদি বেশিরভাগ ব্যয় প্রেরণকারী বহন করে আর সামান্য কিছু ব্যয় পালনকারীও বহন করে, তবু জায়েজ আছে।

তিন. মৃত ব্যক্তি বা যার পক্ষ থেকে হজ করানো হচ্ছে, তার মাতৃভূমি থেকে কেউ হজ করা উচিত।

চার. ইহরাম বাঁধার সময় হজের নিয়ত তার (হজ যার পক্ষ থেকে) পক্ষে হতে হবে; যেমন—এরূপ বলবে যে আমি অমুক ব্যক্তির পক্ষ থেকে হজের নিয়ত করছি।

পাঁচ. ইহরাম মিকাত থেকে বাঁধা উচিত, যদি প্রেরক ওমরাহ করার অনুমতি না দেয়, তাহলে মিকাত থেকে ওমরাহর ইহরাম বাঁধা যাবে না এবং হজে তামাত্তুও করা যাবে না। হ্যাঁ, যদি সে বলে দেয়, যেভাবে ইচ্ছা আমার হজ আদায় করে দেবে, তখন হজে তামাত্তুও জায়েজ হবে। বদলি হজ পালনকারী হজের সফরে যদি প্রেরকের টাকা আলাদা রাখে, নিজের টাকার সঙ্গে না মেশায়, তাহলে আমানত রক্ষা হবে; সতর্কতা সত্ত্বেও নষ্ট হলে জামিন হবে না। পক্ষান্তরে যদি সে নিজের টাকার সঙ্গে মিলিয়ে রাখে, তাহলে নষ্ট হলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। বদলি হজ পালনকারীকে যে টাকা দেওয়া হবে, তাতে খুব সতর্কতা আবশ্যক। অন্যথায় অন্যের হজ বিনষ্ট করার অপরাধে গুনাহগার হতে হবে। তাই সফর শেষে যে অর্থ ও দ্রব্যসামগ্রী (তাদের পয়সায় কেনা) অবশিষ্ট থাকবে, তা ফেরত দেবে। উত্তম পদ্ধতি হলো, প্রেরক প্রথমেই বলে দেবে, এক সফরে ব্যয় বিষয়ক কোনো অসংগতি হলে আমার পক্ষ থেকে মাফ। (ইমদাদুল আহকাম : ২/১৮৭; মুয়াল্লিমুল হুজ্জাজ : ১/২৮১)

ছয়. যদি মৃত ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ যথেষ্ট হয় তাহলে যানবাহনে চড়ে হজ করতে হবে। আর যদি পুরো হজ পায়ে হেঁটে করে, ভাড়ার টাকা সঞ্চয় করে রাখে, তাহলে জরিমানা দেওয়া ওয়াজিব। প্রেরক যদি পদব্রজে হজ করার অনুমতিও দেয় এবং মক্কা থেকে আরাফাতের ময়দানে যাওয়া-আসা যানবাহনে করা ওয়াজিব। আর বাকি সফরে প্রেরক অনুমতি দিলে পদব্রজে করাও জায়েজ আছে। (ইমদাদুল আহকাম : ২/১৮৭)

সাত. যদি জীবিত অক্ষম ব্যক্তির অনুমতি বা মৃত ব্যক্তির অসিয়তের কারণে বদলি হজ করানো হয়, তাহলে তার (প্রেরকের) মাতৃভূমি থেকে কাউকে দিয়ে হজ করানো আবশ্যক। এতে যদি মৃত ব্যক্তির এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ দিয়ে হজের ব্যয় যথেষ্ট না হয় এবং তার ওয়ারিশরাও অতিরিক্ত সম্পদ ব্যয়ে রাজি না হয়, তাহলে ওই টাকায় যেখান থেকে খরচ সংকুলান হয়, সেখান থেকে বদলি হজ করিয়ে দেবে। আর অসিয়তকারী যদি নিজে কোনো স্থান অথবা কিছু সম্পদ নির্ধারণ করে দেয়, তাহলে তার কথা অনুসারে বদলি হজ করাতে হবে। তবে সামর্থ্যবান মানুষের জন্য এরূপ নির্ধারণ মাকরুহ। (আহসানুল ফাতাওয়া ৪/৫২০; ফাতাওয়া রহিমিয়া ৫/২২৮; আহকামে হজ : ১২০)

বদলি হজ কার পক্ষ থেকে করানো হবে?

কোনো বক্তির ওপর হজ ফরজ হয়েছে, সে হজের সময়ও পেয়েছে, কিন্তু কোনো কারণবশত হজ করতে পারেনি; এরপর এমন ওজর বা প্রতিবন্ধকতা এসে গেল যে তার নিজে গিয়ে হজ করার ক্ষমতা আর রইল না অথবা এমন অসুস্থ হয়ে পড়ল, যা থেকে আর সুস্থ হওয়ার আশা নেই অথবা অন্ধ বা প্রতিবন্ধী হয়ে গেল বা বার্ধক্যের দরুন এমন দুর্বল হয়ে গেল যে এখন তার পক্ষে সফর করা সম্ভব নয়, তখন তার জন্য নিজের পক্ষ থেকে কাউকে পাঠিয়ে বদলি হজ করানো, অথবা মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পদ থেকে তার নামে বদলি হজ করানোর অসিয়ত করা ফরজ। বদলি হজের বিষয়ে ব্যাখ্যা হলো, যে সমস্যার কারণে বদলি হজ করানো হলো, ওই ওজর বা সমস্যা বদলি হজ করানোর পর দূর হয়ে গেলে আবার স্বয়ং তার হজ আদায় করা ফরজ হয়ে যাবে। আর আগের বদলি হজটি তার নফল হয়ে যাবে। (আহকামে হজ : ১১৮)

রাসুল (সা.)-এর পক্ষ থেকে কি হজ পালন করা যাবে?

নফল হজের সওয়াব রাসুল (সা.)-এর খিদমতে পেশ করা নিঃসন্দেহে জায়েজ, বরং বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়। এতে রাসুল (সা.)-এর অনুগ্রহের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও সম্মান প্রকাশ পায়। আল্লামা শামী (রহ.) রদ্দুল মুহতারের মধ্যে আল্লামা ইবনে হাজর মক্কির উদ্ধৃতি দিয়ে লিখেছেন : হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) রাসুল (সা.)-এর ওফাতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে ওমরাহ পালন করতেন। (শামী বৈরুত সংস্করণ : ৩/১৪৩)

বদলি হজ আদায় করবে যারা

যে ব্যক্তি নিজে হজ করেনি, তার দ্বারা বদলি হজ করনোকে মাকরূহ তানজিহি বলা হয়েছে। আর যদি বদলি হজকারীর হজের সামর্থ থাকা সত্ত্বেও নিজের হজ আদায় না করে অন্যের হজ আদায় করে তবে তার জন্য বদলি হজ মাকরূহে তাহরিমি অর্থাৎ তা নিষিদ্ধের কাছাকাছি।’

তাই মুসলিম বিবেকবান ও হজের বিধি-বিধান সম্পর্কে জানা ব্যক্তির মাধ্যমে হজ সম্পাদন করানো। আর বদলি হজের ক্ষেত্রে সর্বোত্তম হচ্ছে- যে ব্যক্তি নিজে হজ করেছে এমন ব্যক্তির দ্বারা বদলি হজ করানো। এবং একজন মুত্তাকি আলেম দিয়ে বদলি হজ করানো উত্তম।

* হানাফি মাজহাব অনুযায়ী যে ব্যক্তি এখনো নিজের হজ করেনি, সে-ও কারো পক্ষ থেকে বদলি হজ করতে পারবে, তবে মাকরুহ হবে। (আপকে মাসায়েল : ৪/৬৯)

* যে ব্যক্তি এখনো নিজের হজ করেনি, তাকে হজে পাঠানো মাকরুহে তানজিহি অর্থাৎ অনুত্তম। তারপরও যদি হজে যায়, তাহলে বদলি হজ আদায় হয়ে যাবে। অতএব, এমন মানুষকে পাঠানো উচিত, যে একবার হজ করেছে। চাই সে ধনী হোক বা দরিদ্র। এ বিষয়ে ধনী-দরিদ্রের পার্থক্য নেই। (আপকে মাসায়েল : ৪/৭৬; ফাতাওয়া দারুল উলুম : ৬/৫৭৩; কিতাবুল ফিকহ : ১/১৩২২)

* কোনো নারীর পক্ষ থেকে বদলি হজ করাতে হলে অন্য নারী দিয়েই করাতে হবে এমন কোনো আবশ্যকতা নেই। বরং নারীর পক্ষ থেকে পুরুষও বদলি হজ করতে পারবে এবং পুরুষের পক্ষ থেকে নারীও হজ করতে পারবে। (আপকে মাসায়েল : ৪/৭৫)

* নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক) বদলি হজ করতে পারবে না। (আপকে মাসায়েল : ৪/৭৭)

* নারী ও দাসও বদলি হজ করতে পারবে। (কিতাবুল ফিকহ : ১/১১৬৬)

সিলেট সমাচার
সিলেট সমাচার