• শনিবার   ০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ||

  • অগ্রাহায়ণ ২০ ১৪২৮

  • || ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৩

সর্বশেষ:
তাহিরপুরে শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়নে নৌকার একক প্রার্থী সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীদের হুশিয়ারি! নিখোঁজের দু’দিন পর রোমানার লাশ মিললো নদীতে শেষ ওভারের রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ে হোয়াইটওয়াশ বাংলাদেশ পরীক্ষার্থীদের হলে পৌঁছে দিচ্ছে সিলেট জেলা ছাত্রলীগ

গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারার ভয়াবহ ভাঙন

সিলেট সমাচার

প্রকাশিত: ১০ নভেম্বর ২০২১  

সব হারিয়ে এখন অন্যের বাড়িতে থাকেন সমশুল হক। অথচ এক সময় তাঁর বাড়ি ছিল, উঠোনে গাছ-গাছালি ছিল। সবই গেছে কুশিয়ারার পেটে। তার বসতভিটায় এখন কুশিয়ারার জল থৈ থৈ করে। পরের জায়গায় এক টিনের চালা তৈরি করে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন সমশুল।

শুধু সমশুল নন। আব্দুস সোবহান, আব্দুল রহীম, আব্দুল লতিফ, লাল মিয়া, মারুফ মিয়া, আহাদ মিয়া, ফরহাদ মিয়া, রইব আলীসহ আরো অনেকের একই অবস্থা। তারা সবাই গোলাপগঞ্জ উপজেলার বুধবারিবাজার ইউনিয়নের লামাচন্দরপুর এলাকার বাসিন্দা। কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়ে তারা এখন নিঃস্ব।

অন্যদিকে যারা এখনও কোনোমতে টিকে আছেন তারাও ভাঙনের কবলে পড়ে নিঃস্ব হওয়ার হুমকির মুখে। কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে হুমকিতে গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জের বিভিন্ন স্কুল, মসজিদ, মাজার, বাজার, কবরস্থান, ফসলি জমি ও বসতবাড়ি।

দুই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত থাকলেও তীর সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। নদীভাঙন রোধ ও তীর সংরক্ষণে ২০০৬-০৮ অর্থবছরে বেশকিছু এলাকায় ২১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ বা সংস্কার না হওয়ায় প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন এলাকাও এখন ভাঙনের কবলে।

স্থানীয়রা বলছেন, গোলাপগঞ্জের শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের কদুপুর এলাকায় একদিকে নদীভাঙন, অন্যদিকে হাওরের ঢেউয়ে হুমকিতে পড়েছে ঘরবাড়ি ও যোগাযোগ সড়ক। ভাঙন অব্যাহত থাকলে কুশিয়ারা-হাকালুকি হাওর একাকার হয়ে যেতে পারে।

পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সিলেটের কর্মকর্তারা বলছেন, সুরমা-কুশিয়ারা নদীর সিলেট অঞ্চলে তীর সংরক্ষণে চার হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তুত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এটি অনুমোদন হলে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে, গোলাপগঞ্জের শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের কদুপুর, বসন্তপুর, মানিককোনা, ভেলকোনা ও মঈনপুর এলাকায় নদীভাঙন রোধে ২০০৬ সালে প্রকল্প হাতে নেয় পাউবো। এর ফলে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পায় প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকা। কিন্তু, পরে আর কোনো খোঁজ রাখেনি পাউবো।

গোলাপগঞ্জের বুধবারিবাজার, বাদেপাশা, শরীফগঞ্জ, ঢাকাদক্ষিণ, আমুড়া ও ভাদেশ্বর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে কুশিয়ারা নদী। এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, নদীর তীর ঘেঁষা শরীফগঞ্জ ইউনিয়নের খাটকাই-মেহেরপুরের ব্যস্ততম সড়কটি নদী ভাঙনে বিলীন হওয়ার পথে। এরই মধ্যে পনাইচক জামে মসজিদ, মেহেরপুর বাজার, পনাইরচক দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়, সৈয়দ শদাইশাহ মাজার, কুশিয়ারা বাজার, পশ্চিম খাটকাই প্রাথমিক বিদ্যালয় ও কবরস্থানে ভাঙন শুরু হয়েছে।

এলাকার যুবক জাবেদুর রহমান রিপন জানান, কিছুদিন আগে পনাইরচক স্কুলের কাছে যোগাযোগের একমাত্র সড়কটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। ভোগান্তিতে পড়েন স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও পথচারীরা। পরে, বিকল্প রাস্তা তৈরি করে চলাচলের সুযোগ তৈরি করা হয়।

ইউনিয়নের স্থানীয় লোকজন জানান, ইতোমধ্যে কুশিয়ারা নদী ভাঙনের শিকার হয়ে খাটকাই-পনাইচক গ্রামের শত শত পরিবার নিঃস্ব হয়েছে। অনেকেই বাড়িঘর হারিয়ে অন্যত্র বসবাস করছেন। নদী তীরবর্তী ফসলের জমি হারিয়ে যাচ্ছে। অব্যাহত ভাঙনে আরও অসংখ্য বাড়িঘর ও স্থাপনা বিলীন হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

নদীতে ভাঙন দেখা দেওয়ায় এসব এলাকার লোকজন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। মেহেরপুর বাজার (কালাবাজার), কাদিপুর বাজার, নয়াবাজারসহ বেশ কয়েকটি বাজারের বেশকিছু দোকান ইতোমধ্যে কুশিয়ারা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ব্যবসায়ীরা আতঙ্কে আছেন।

একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে কর্মরত স্থানীয় বাসিন্দা মাহবুব আহমদ বলেন, ‘নদীভাঙনের বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা চেয়ারম্যানকে অবগত করেছি। সংশ্লিষ্টদের শরণাপন্ন হয়েও আমরা ফল পাচ্ছি না। শতবর্ষের প্রাচীন প্রতিষ্ঠান পনাইরচক উচ্চ বিদ্যালয় ঝুঁকিতে আছে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে আমরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি।’

এ বিষয়ে শরীফগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ মুহিত হীরা বলেন, ‘চেয়ারম্যান হিসেবে আমার এলাকার নদীভাঙন রোধে স্থানীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম নাহিদসহ সংশ্লিষ্টদের দপ্তরে বারবার শরণাপন্ন হয়েছি। দ্রত ব্যবস্থা নিতে এমপি দুই বছর আগে একটি আধাসরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন। কিন্তু, পাউবো এখনও এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয়নি।’

ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান এম.এ মুছাব্বির বলেন, ‘২০০৬ সালে অনেক চেষ্টা করে গোলাপগঞ্জ ও ফেঞ্চুগঞ্জে কদুপুর-বসন্তপুর-মানিককোনা-ভেলকোনা মঈনপুর এলাকা পর্যন্ত কুশিয়ারা নদীর ভাঙন রক্ষা প্রকল্প আদায় করেছি। তৎকালীন বেসরকারি কমিশনের চেয়ারম্যান ইনাম আহমদ চৌধুরী এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন এবং ২১ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ সম্পন্ন হয়। বড় অঙ্কের টাকা খরচ করে প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও আর কেউ ফিরে তাকায়নি। তাই, নদীর স্রোত ব্লক সরে যাচ্ছে এবং আবারও ভাঙন দেখা দিয়েছে।’ ভাঙন রোধে জরুরিভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ প্রয়োজন বলে জানান তিনি।

উপজেলার বুধবারিবাজার ইউনিয়নের কালিজুরি, চন্দরপুর বাজার থেকে লামাচন্দরপুর, বনগাঁও থেকে বুধবারিবাজার ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত নদীতীর ভাঙন দেখা দিয়েছে। হুমকির মুখে আছে এলাকার অন্যতম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাগিরঘাট উচ্চ বিদ্যালয়। লামাচন্দরপুর এলাকার বিশাল অংশ নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বসতভিটা হারিয়ে মানুষ অন্যের বাড়িতে, হাওরে অথবা খুপড়িঘরে আশ্রয় নিয়েছে।

এ এলাকায় কুশিয়ারার নদীভাঙনে নিঃস্ব সমছুল হক বলেন, ‘বাড়িঘর নদীতে গেছে। এখন অন্যের জায়গায় একটি টিনের চালায় বসবাস করি। বারবার জানালেও ভাঙনরোধে কোনো ধরনের ব্যবস্থা নেয়নি কর্তৃপক্ষ।’

তার মতো আব্দুস সোবহান, আব্দুল রহীম, আব্দুল লতিফ, লাল মিয়া, মারুফ মিয়া, আহাদ মিয়া, ফরহাদ মিয়া, রইব আলীসহ অনেকেই নদী ভাঙনের কারণে ভিটেমাটি হারিয়েছেন।

এদিকে, বাদেপাশা ইউনিয়নের হাজিরকোনা গ্রাম থেকে ডেপুটিবাজার-মফজ্জিল আলী দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয়, বাগলাছঘরি থেকে বাগলাবাজার এবং আছিরগঞ্জ খাল থেকে আমকোনা মাজার পয়েন্ট ভাঙনের কবলে রয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকের বাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।

হুমকির মুখে রয়েছে মফজ্জিল আলী দ্বিপাক্ষিক উচ্চ বিদ্যালয় ও বাগলা বাজার। বাদেপাশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মস্তাক আহমদ বলেন, ‘কুশিয়ারা নদীর ভাঙনে অনেক ঘরবাড়ি হারিয়ে গেছে। নদীভাঙন রোধে কোনো বরাদ্দ না থাকায় আমরাও কিছু করতে পারছি না।’ ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার মোমিনপুর, মইনপুর, চানপুর, নারায়ণপুর, শাহাদতপুর, উত্তর ইসলামপুর ও বারোহাল গ্রামে নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। এ কারণে নদীতীরবর্তী ঘরবাড়ির লোকজন আতঙ্কে সময় পার করছেন।

মোমিনপুর গ্রামের প্রধান রাস্তা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। রাস্তা না থাকায় তারেক মিয়ার বাড়ির উপর দিয়ে চলাচল করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। গত বছর শুষ্ক মৌসুমে এলাকাবাসীর উদ্যোগে ভাঙন রোধে রাস্তায় মাটি ফেলে মেরামত করা হয়। কিন্তু, বর্ষা মৌসুমে এটিও নদীগর্ভে চলে যায়।

জানা গেছে, মোমিনপুর গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীর বসতভিটা নদীগর্ভে হারিয়ে যায়। নতুন করে ঘর নির্মাণ করেছেন। সেখানেও দেখা দিয়েছে ভাঙন। মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘দুইলাখ টাকা দিয়ে জায়গা কিনে দুটি ঘর নির্মাণ করেছিলাম। সবই চলে গেছে কুশিয়ারার গর্ভে। নদীতীর সংরক্ষণে যথাযথ ব্যবস্থা নিলে আমার এমন দশা হত না।’

এ ব্যাপারে ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রাখী আহমেদ বলেন, ‘মোমিনপুরসহ যেসব এলাকায় নদীভাঙনের শঙ্কা রয়েছে সেগুলোতে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে গত ফেব্রুয়ারিতে পাউবোকে চিঠি দিয়েছি। তারা বলেছে, পর্যাপ্ত বাজেট নেই। চলতি অর্থবছরেও যোগাযোগ করেছি। বাজেটের জন্য তারা মন্ত্রণালয়ে লিখেছে এবং একটি প্রকল্প হাতে নেওয়া হচ্ছে বলে তারা আমাকে জানিয়েছে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের নির্বাহী প্রকৌশলী আসিফ আহমেদ বলেন, ‘কুশিয়ারা ও সুরমা নদীর ভাঙন রোধ ও তীর সংরক্ষণে এই মুহূর্তে কোনো প্রকল্প নেই। একটি প্রকল্প প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে; এতে ব্যয় হবে চার হাজার ৯২ কোটি টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।’

সিলেট সমাচার
সিলেট সমাচার