• বুধবার   ৩০ নভেম্বর ২০২২ ||

  • অগ্রাহায়ণ ১৬ ১৪২৯

  • || ০৫ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৪

সর্বশেষ:
শান্তিগঞ্জে সুপেয় পানি পাবে ১৬০০ পরিবার নিউইয়র্কের পুলিশ অফিসার বড়লেখার তৌফিকের কৃতিত্ব শেষ ষোলোয় টিকে থাকতে রাতে মাঠে নামছে আর্জেন্টিনা জঙ্গি ছিনতাই: আরও এক পুলিশ সদস্য বরখাস্ত সুনামগঞ্জ সীমান্ত থেকে দেড় কোটি টাকার তক্ষক জব্দ ঠান্ডায় হবিগঞ্জ সদর হাসপাতালে বাড়ছে শিশু রোগীর চাপ হবিগঞ্জে ভুলে ভরা প্রশ্নপত্রে বার্ষিক পরীক্ষা!
৩২

মীতৈ মণিপুরীদের বৈচিত্র্যময় বিয়ের রীতিনীতি

সিলেট সমাচার

প্রকাশিত: ২৪ নভেম্বর ২০২২  

বিয়ে একটি সামাজিক রীতি। দুজন নারী-পুরুষের সামাজিক বন্ধন তৈরি করার মাধ্যম বিয়ে। আমাদের দেশে তো বটেই সামাজিক এই উৎসব নিয়ে পুরো বিশ্বেই আছে নানান সংস্কৃতি। হলুদ, মেহেদি, বিয়ে, বৌভাত কত আয়োজন এক বিয়েকে কেন্দ্র করে।

তবে মীতৈ মণিপুরীদের বিয়ে অনুষ্ঠানে রয়েছে আলাদা এক ঐতিহ্য ও বৈচিত্রের ছোঁয়া। তাদের বিয়ের প্রধান প্রধান অনুষ্ঠান চলতে থাকে চার থেকে সাত দিন পর্যন্ত। আজ চলুন জেনে নেওয়া যাক বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী মীতৈ মণিপুরীদের বিবাহ উৎসবের সংস্কৃতি, রেওয়াজ, আচার-অনুষ্ঠান সম্পর্কে।

ভারতের উত্তরপূর্ব দিকে আসাম ও ব্রহ্মদেশের সীমান্তে পাহাড় ঘেরা ছোট্ট রাজ্য মণিপুর। এ রাজ্যের নাম অনুযায়ী মণিপুরী জনগোষ্ঠী অন্যতম এক সম্প্রদায় মীতৈ ৷ নৃবিজ্ঞানীর মতে, মণিপুরী সম্প্রদায় মঙ্গোলীয় মানবধারার তিব্বত বর্মী পরিবারের কুকিচীন গোষ্ঠীর লোক। এ সম্প্রদায়ের বিয়ে নিয়ে জানতে হলে প্রথমে মণিপুরী মীতৈদের ধর্ম সম্পর্কে কিছু জ্ঞান রাখা প্রয়োজন।

ধর্মবিশ্বাসের দিক থেকে মণিপুরীরা প্রধানত সনাতন ধর্মের চৈতন্য প্রবর্তিত বৈষ্ণব ধর্মের অনুসারী। তবে মণিপুরীদের মধ্যে এখনো অনেকেই প্রাচীন ধর্ম অর্থাৎ ‘অপোকপা’ বা ‘সনামহী লাইনীং’ অনুসরণ করে থাকেন। মীতৈ মণিপুরীদের ‘সনামহী লাইনীং’ অনুসারীরা বিয়ের অনুষ্ঠানে কনেরা ‘পোৎলই’ পরে না। এর পরিবর্তে তারা ফানেক পরেন। এছাড়া তাদের পবিত্র মন্ত্রগুলো ক্লাসিক্যাল মীতৈ ভাষায় করা হয়। আবার মণিপুরী সনাতন মীতৈ হিন্দুদের বিয়েতে কনেরা ‘ফানেক’-এর পরিবর্তে পরেন ‘পোৎলই’ (মণিপুরীদের বিশেষ পোশাক)। তারা ধ্রুপদী মণিপুরী ভাষা ছাড়াও অনেক পবিত্র মন্ত্র সংস্কৃত ভাষায় করেন। মীতৈদের উভয় ধর্মে বরের গায়ে থাকে ধুতি ও পাঞ্জাবির সঙ্গে শাল।

মনিপুরীদের ‘পোৎলই’-এর ডিজাইনের বেসিক/মূল ডিইজাইন লৈইফানেক এর আচলের ডিজাইনের উপর ভিত্তি করে পোৎলই তৈরি করে মণিপুরে মহারাজ ভাগ্যচন্দ্র (জয় সিং) ১৭৭৯ সালে (সর্বপ্রথম রাসলীলা নৃত্যে ব্যবহার করেন)। এটিকে একটি ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি। বিশেষ করে মণিপুরের মধ্যে বৈষ্ণব ধর্ম অনুসারীদের জন্যে।

মীতৈ মণিপুরীদের বিয়ের রীতিনীতি ধর্ম অনুযায়ী কিছু কিছু ক্ষেত্রে আলাদা। তবে বেশিরভাগই রীতিনীতি একই। কয়েকটি ধাপে মীতৈ মণিপুরীদের বিয়ের পুরো আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। আসুন জেনে নেওয়া যাক সেগুলো-

‘মাঙন কাবা’(বাগদান)
প্রাথমিকভাবে পরিচয়ের সূত্র ধরেই পছন্দ করা হয় বর-কনে। এখানে কোনো ঘটকের প্রচলন নেই। বরের পক্ষ থেকে কনের বাড়িতে প্রথম যে প্রস্তাব পাঠানো হয় একে মীতৈ মণিপুরী ভাষায় বলা হয় ‘মাঙন কাবা’। এদিন বরের অভিভাবকগণ ও পাড়ার কিছু সংখ্যক লোকজনসহ কনের বাড়িতে মিষ্টি নিয়ে বিবাহের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের দিনক্ষণ ধার্য করতে যান। বলতে গেলে এই পর্যায় থেকেই মীতৈ মণিপুরীদের বিয়ের সামাজিক অনুষ্ঠান শুরু।

হৈজিংপত (মিষ্টিমুখ)
‘মাঙন কাবা’ এর পরবর্তী ধাপে রয়েছে বিয়ের ব্যাপারে এলাকাবাসীকে অবগত করার ‘হৈজিংপত’ নামে একটা আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে, যার বৈশিষ্ট্য হলো বর কনে উভয়ের পক্ষ থেকে নানান উপহার সামগ্রী বিনিময় করা। এদিন বর পক্ষ কনের বাড়িতে বেশ লোকজন নিয়ে ফল ফলাদি, মিষ্টি, কনের জন্যে (স্বর্ণ/কাপড়) নিয়ে হাজির হয় দিনের বেলা। এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান মীতৈ মণিপুরীদের বিয়েতে। এদিন যেহেতু মণিপুরী সনাতন ও সানামাহি ধর্মে অনুসারীদের কাবিননামা বা লিখিত এই ধরনের আইন বা রীতিনীতি নেই এজন্য ঐদিন স্বাক্ষী হিসেবে উভয়ই পক্ষের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে মৌখিক শপথ গ্রহণ করে অভিভাবকরা।

‘বর-দাওয়াত’
‘বরবার্তন’ এর পরের পর্বটি মূলত বিয়ের দিন। এদিন কনের বাড়িতে বরকে নিমন্ত্রণ করা হয়। এর নাম ‘বরবার্তন’। বরকে কনের পক্ষ থেকে বিবাহের ১ দিন পূর্বে বিবাহের জন্যে নিমন্ত্রণ করা হয়। যদি কনে ও বর পক্ষের বাড়ি দুরত্ব বেশি না হয় তাহলে নিয়ম রক্ষার্থে বিবাহের ৫-৬ ঘণ্টা পূর্বে নিমন্ত্রণ করা হয় বিবাহ অনুষ্ঠানের জন্যে কনে পক্ষ থেকে।

মণিপুরী বিয়েতে কেউ চেয়ারে বসেনা, আসন পেতে মাটিতে বসে। বিয়েতে সবার জন্য থাকে আলাদা বসার জায়গা। বিয়ের দিন বর ও কনে তাদের আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং সমাজের অন্যান্য সদস্যদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বামী-স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পাবেন। দিনব্যাপী আচার-অনুষ্ঠানে বর ও কনের পুরো পরিবার জড়িত থাকে এবং মা-বাবারা প্রধান ভূমিকা পালন করে।

মীতৈ মণিপুরীদের বিয়ের দিনের যেগুলো আয়োজন করা হয় তা তুলে ধরা হলো-

মালা তৈরি
বিয়ের দিন, মূল অনুষ্ঠানের জন্য কনে জুঁই ফুল দিয়ে তার বান্ধবীদের সঙ্গে মিলে নিজের বিয়ের একজোড়া মালা গাঁথে। ঐতিহ্য অনুসারে, কনে মালা তৈরি করার সময় শুভ চিন্তা ভাবনা এবং সমৃদ্ধির জন্য প্রার্থনা করে। নির্দিষ্ট ঋতুতে যখন কুন্ডো প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় না, তখন ফুলটি অন্যান্য অনুরূপ সাদা ফুলের সঙ্গে মিশিয়ে তৈরি করা হয়। তবে মূল মালার জন্য কয়েকটি কুঁড়ি বা ফুলের টুকরো বাধ্যতামূলক।

বরযাত্রা
বিয়ের দিন বর দুপুর ২ থেকে আড়াইটার মধ্যে বাড়ি থেকে বের হয়, প্রকৃত সময় নির্ভর করে কনের বাড়ি থেকে তার বাড়ি কতদূর। বর তার বন্ধুদের সঙ্গে আয়না এবং ছাতা নিয়ে কনের বাড়ির দিকে এগিয়ে যান সুপারভাইজার (বরের পুরুষ গাইড) এবং রঙিন ফুল ব্যান্ড পার্টির সঙ্গে। সাধারণত ব্যান্ড পার্টি আধুনিক বাদ্যযন্ত্র এবং ড্রাম বাজায়। ঐতিহ্যগত শৈলীতে, পেনা (মণিপুরের প্রাচীনতম স্ট্রিং যন্ত্র) এবং ল্যাংডেন ড্রামের মতো ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্র বাজানো হয়।

বরবরণ
বর পক্ষ কনের বাড়িতে পৌঁছানোর আগে একদল নারী ধর্মীয় সামগ্রী বহন করে কনের বাড়িতে যায়। বরকে কনের বাড়ির প্রধান ফটকে কনের পক্ষ থেকে পবিত্র আগুন দিয়ে বরণ করা হয়। বর ও তার দলকে একটি ঘেরা জায়গায় বসিয়ে দেওয়া হয়।

সাতপাঁকে বাঁধা
বিয়ের দিনের অন্যান্য অনুষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সাজানো কুঞ্জে সাতপাঁকে বাঁধা। এ সাতপাঁকে অংশ নেন শুধু কনে। আর বর বসে থাকে পিঁড়িতে। অবশ্য হিন্দু সম্প্রদায়ের বিয়েতে বর-কনে উভয়কেই সাত পাঁকে অংশ নিতে হয়। এই সাত পাঁক পর্ব শেষে বর তুলে নেয় কনেকে। তখন বিয়ের মূল অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যায়।

লুহোঙবা (বিবাহ)
এটিই মূল পর্ব। ধর্মীয়ভাবে ও সামাজিক রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়ে থাকে। মীতৈই সনাতন ধর্মালম্বীরা এটিকে রাধা-কৃষ্ণ (আত্ম আর পরমাত্মার) মিলনের প্রতীক হিসেবে ধরে এবং মীতৈই সানামাহী ধর্মালম্বীরা এটিকে তাদের দেবতা লাইনিংথৌ-লাইরেম্বীর (সানা ফম তংবা) রাজ্য অভিষেক হিসেবে গ্রহণ করেন। (সবগুলোতে শাস্ত্রীয় রীতি-নীতি অনুসরণ করা হয়)

কনের পরিবার কনে এবং তার স্বামীর জন্য ঘর সাজানোর উপকরণ-বিছানা, আলমারি, সোফা, টেলিভিশন, অলংকার, জামাকাপড়, বাসনপত্রের ব্যবস্থা করে। বিয়ের দিন বা তার আগে বরের বাড়িতে এই উপকরণগুলো আগেই পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বিয়ের আমন্ত্রণটি বিয়ের অনুষ্ঠানের আগে বন্ধু এবং আত্মীয়দের কাছে পাঠানো হয়।

বিবাহের অনুষ্ঠানে সাধারণত কীর্তন হয় যেখানে উপযুক্ত ধর্মীয় গান গাওয়া হয়। বৈষ্ণবধর্ম মণিপুরে প্রবেশের আগে এখনকার মতো সংকীর্তনের সঙ্গে বিয়ের অনুষ্ঠান হতো না। কনের পরিবারের সদস্যরা, আত্মীয়স্বজন এবং বন্ধুরা একত্রে বরের বাড়িতে গিয়ে তাকে বিদায় জানায়।

মাঙানি চাকাউবা (মধ্যাহ্নভোজ অভ্যর্থনা)
মাঙানি চাবা (ফিরতযাত্রা) বিবাহের ৫ দিন পর কনে, বর ও বর-আত্মীয় স্বজনরা কনে তার বাবার বাড়িতে ফিরতি অনুষ্ঠান হয়। এতে খাবারের আয়োজন করা হয়। এভাবে বিবাহের বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে মণিপুরী সনাতন ও সানামাহী ধর্মের অনুসারীরা পালন করে থাকে।

খুৎ লৌখাপা (বৌ ভাত)
খুৎ লৌখাপাতে সাধারণত মাঙানির (৫ দিন পর) পর নতুন বউ নিজ হাতে রান্না করে শ্বশুরবাড়িসহ গ্রামের মুরুব্বিদের খাওয়ায়। মূলত রান্না বাড়ির সবাই মিলেই করে, নতুন বউকে দিয়ে শুধু হালকা কাজগুলো করানো হয়। এর একদিন আগেই গ্রামের মুরুব্বিদেরকে দাওয়াত দেওয়া হয়। আবার খাওয়া-দাওয়ার পর গ্রামের ও গোষ্ঠীর মুরুব্বিরা দোয়া/আশির্বাদ করে যায় নতুন বউকে। আবার কেউ কেউ টাকাও দেন।

লেখক: মণিপুরী গণমাধ্যমকর্মী।

সিলেট সমাচার
সিলেট সমাচার