• শনিবার   ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২১ ||

  • আশ্বিন ৩ ১৪২৮

  • || ০৯ সফর ১৪৪৩

সর্বশেষ:
দোয়ারাবাজারে বিভিন্ন কর্মসূচি পরিদর্শনে অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার অবশেষে শুরু হচ্ছে সিলেটের সেই দুই সড়কের সংস্কারকাজ করোনা: ফের মৃত্যুর মিছিলে সিলেটে সিলেট জেলা ছাত্রলীগের প্রথম সভাপতি ফয়জুল আর নেই

২ টাকা বেতনে চাকুরি করা রাখালটিই হয়েছিল বাউল সম্রাট

সিলেট সমাচার

প্রকাশিত: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১  

২০১৯ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির আমন্ত্রণে একটা সম্মেলনে যাওয়ার সুযোগ হয়। প্রথমদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে হলেও পরদিনের মূল অনুষ্ঠানটি ছিল কক্সবাজার সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। অনুষ্ঠান শেষে পাশেই থাকা বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের পানিতে নেমে পড়ি। গোধূলির শেষ সময়ে সাগরের নোনাজলে লাফালাফি করছি। পাশেই সাঁতার কাটছিলেন মধ্যবয়সী এক ভদ্রলোক। কি করি, কোথা থেকে আসছি এসব প্রশ্নের আবহে ভাব বিনিময় করছিলেন। মূল বাড়ি জিজ্ঞেস করলে উত্তরে বলি, বাউল সম্রাটের এলাকার ছেলে। ভদ্রলোক কথা বলার আগ্রহ বাড়িয়ে দেন।

শাহ্ আবদুল করিমের এলাকার মানুষ আপনি! সমুদ্রের দানবরূপী আছড়ে পড়া ঢেউয়ের সাথে দুলে দুলেই কিছুক্ষণ কথা হলো। ভদ্রলোক জয়পুরহাটের এডিসি ছিলেন। কেবলমাত্র বাউল সম্রাটের এলাকার মানুষ বলেই পরবর্তীতে প্রায়ই কল দিতেন, খাতির করে কথা বলতেন। করিমভক্ত এই সরকারি কর্মকর্তার প্রেম আমায় মুগ্ধ করতো। আবদুল করিমের প্রতি তার শ্রদ্ধা-ভক্তি আর ভালোবাসা দেখে গর্বে বুকটা ভরে গিয়েছিল।

আমাদের ঠিক পাশের গ্রামের নামটিই উজানধল। যেখানে বাস করতেন প্রখ্যাত বাউল সাধক শাহ্ আবদুল করিম। এলাকায় থাকতে তার গুরুত্বটা তেমন একটা বুঝতে পারতাম না। বাড়ির পাশে হলে যেমনটা সবারই হয়। যখন স্কুলে যাওয়া-আসা শুরু করি, তখন সুরে-বেসুরে দলবেঁধে বন্ধুরা গাইতাম আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতামসহ তাঁর লেখা অসংখ্য গানের পঙক্তি। তখনও জানতাম না কালজয়ী এসব গানের মূল কারিগরের গল্পটা। পরে স্কুল-কলেজ পাস করে নিজ জেলা সুনামগঞ্জ ছেড়ে সিলেটের এমসি কলেজে ভর্তি হলে তীব্রভাবে বাউল সম্রাটের গুরুত্বটা অনুভব করতে থাকি।

ভ্রমণ কিংবা সাংবাদিকতার কাজে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর সময়ে মানুষের মুখে মুখে বাউল সম্রাটের নামটি অনন্য মর্যাদায় উচ্চারিত হতে শুনি। সুনামগঞ্জের বাইরে এতোএতো মানুষ আমার এলাকার মানুষটাকে ভালোবাসে, সেটা লক্ষ করে বরাবরই উদ্বেলিত হই। তখন নিজেকে বাউল সম্রাটের এলাকার মানুষ বলে পরিচয় দিতে শুরু করি। ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে পঠনপাঠন বাড়িয়ে দিলাম।

১৯১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি সিলেট থেকে ৭৪ কিলোমিটার দুরে জল-জ্যোস্নার শহর সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার তাড়ল ইউনিয়নের উজানধল গ্রামের দরিদ্র এক কৃষক পরিবারে জন্ম নেন আবদুল করিম।

পিতা ইব্রাহীম আলী ও মাথা নাইওরজান বিবির পাঁচ কন্যার একমাত্র ভাই করিম ছিলেন সবার বড়। দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেওয়া করিম লেখাপড়ার তেমন সুযোগ পান নি। একসময় গ্রামের নৈশ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। নৈশ বিদ্যালয়ে পড়লে ব্রিটিশরা ধরে নিয়ে যাবে। এসব ভয় দেখিয়ে মাত্র ৮ দিনের মাথায় তার পড়ালেখার সমাপ্তি করানো হয়৷ পরবর্তীতে রাখালের কাজ শুরু করেন। মাঠে গরু চড়ানোর সময় করিম নিজের মতো গান গাইতেন। মহাজনের বাড়িতে ২ টাকা বেতনে রাখাল থাকার সময়ে আবদুল করিমকে তীক্ষ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়। চরম বঞ্চনা আর আর অবহেলার মধ্যদিয়েই দিনাতিপাত করতেন ছোট্ট করিম। এসবের মাঝেও কখনও সুর-বিমুখ হননি গানপাগল করিম। একটা সময় তার মধুর কণ্ঠে গাওয়া গানগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে যায়। বিভিন্ন আসরে গান গাওয়ার জন্য ডাক আসতো। এতে তার প্রিয় দাদা ও গুরুজনেরা সাহায্য করেন। ধীরে ধীরে তার গানের খ্যাতি চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। আবদুল করিমের নামের আগে যুক্ত হয় শাহ্ ।

জীবদ্দশায় কালনী নদীর তীরে বসে তিনি রচনা করেছেন অসংখ্য বাউল গান। ভাটিবাংলার অপার সৌন্দর্য তিনি ধারণ করেছিলেন তার হৃদয় সত্তায়। সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা তাকে তিলেতিলে পীড়ন করতো। তার গানে গ্রামবাংলার জীবনচিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন সুনিপুণভাবে। গানে গানে তিনি হয়ে উঠেছিলেন মানুষের আত্মার আত্মীয়, অকৃত্রিম দেশপ্রেমিক ও গণমানুষের শিল্পী।

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত না হলেও, তিনি ছিলেন স্ব-শিক্ষিত বাউল। আবদুল করিমের লেখা ও সুর করা গানের সংখ্যা প্রায় ৫শ এর মতো। বাংলা একাডেমি থেকে তার ১০টি কালজয়ী গান ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। এছাড়া তার ৬টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। সংগীত সাধনায় অসাধারণ অবদানের জন্য একুশে পদকসহ বিভিন্ন সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অসংখ্য পদক ও সম্মাননা পেয়েছেন বাউল সম্রাট।

ভাটির মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালবাসার পাশাপাশি তার গান কথা বলতো সকল অন্যায়-অত্যাচার, কুসংস্কার আর সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে।

তেজোদ্দীপ্ত এই বাউল তার গানের জন্য নিকট সান্নিধ্য পেয়েছিলেন মাওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও বঙ্গবন্ধুর মতো প্রখ্যাত রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের।

হাওরের গানকে বিশ্ব দরবারে নিয়ে যাওয়া কিংবদন্তী বাউল সম্রাট শাহ আবদুল করিমের ১২তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ রবিবার (১২ সেপ্টেম্বর)। ২০০৯ সালের এই দিনে সিলেটের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভাটির মানুষ আর অগণিত ভত্তানুরাগীদের কাঁদিয়ে ৯৩ বছর বয়সে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান মানব দর্শনের এই কবি। মৃত্যুর পর উজানধল গ্রামের নিজ বাড়িতে প্রিয়তমা স্ত্রী সরলা খাতুনের কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন প্রখ্যাত এই বাউল সাধক।

ক্ষণজন্মা মানুষেরা পৃথিবী থেকে কখনও মুছে যান না। চিরাচরিত নিয়মে আত্মার বিদায় ঘটলেও তারা বেঁচে থাকেন আপন কীর্তির মাঝে। বাউল সম্রাট শাহ্ আবদুল করিমও যুগ -যুগ ধরে বেঁচে থাকবেন তার অমর কীর্তি আর অগণিত ভক্তানুরাগীর মাঝে।

তথ্যসূত্র:

১. বাউল সম্রাটের রচনাসমগ্র

২. শাহ্ আবদুল করিমের শিষ্য বাউল রণেশ ঠাকুর,

৩. বাউল আব্দুর রহমান

৪. ভাটি বাংলা বাউল একাডেমি ও গবেষণা কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক দুলন চৌধুরী।

লেখক: আশরাফ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক এমসি কলেজ রিপোর্টার্স ইউনিটি

সিলেট সমাচার
সিলেট সমাচার