মঙ্গলবার   ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯   আশ্বিন ২ ১৪২৬   ১৭ মুহররম ১৪৪১

সর্বশেষ:
মেট্রোরেলের জন্য পুলিশের আলাদা ইউনিট গঠনের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর সিলেটে ঝাড়ু হাতে ৩ ব্রিটিশ এমপি হাওরাঞ্চলে বর্গা যাচ্ছে না জমি আমি অনুতপ্ত, ক্ষমাপ্রার্থী: রাব্বানী টি-টোয়েন্টি দলে বড় রদবদল প্রবাসীদের এনআইডি পেতে সহায়তা করবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ন্যায্যমূল্যে খোলা বাজারে টিসিবির পেঁয়াজ বিক্রি শুরু সোমবার ছাত্রলীগের ভাবমূর্তি ফেরাতে চান নতুন নেতারা
৮৪

হজের শিক্ষা ও হজ–পরবর্তী করণীয়

ধর্ম ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৩ আগস্ট ২০১৯  

ইসলামের মূল পঞ্চ ভিত্তির অন্যতম হজ। পবিত্র হজ আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার একটি বিশেষ বিধান। আল্লাহ হজ পালনের মধ্যে মহান উদ্দেশ্য নিহিত রেখেছেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রকৃত হজের পুরস্কার বেহেশত ব্যতীত অন্য কিছুই হতে পারে না। সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে যাঁরা হজ পালন করবেন, আল্লাহপাক তাঁদের হজ কবুল করবেন এবং তাঁদের জন্য অফুরন্ত রহমত ও বরকত অবধারিত।

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘সুবিদিত মাসসমূহে হজব্রত সম্পাদিত হয়। অতঃপর যে কেউ এই মাসগুলোতে হজ করা স্থির করে, তার জন্য অশ্লীলতা, কুৎসা, অন্যায় আচরণ, ঝগড়া ও কলহ-বিবাদ বিধেয় নয়।’ (সুরা-২ বাকারা; আয়াত: ১৯৭)। হজের এই শিক্ষা নিজের জীবনে আজীবন লালন ও ধারণ করতে হবে। সর্বদা তর্কবিতর্ক ও ঝগড়াবিবাদ পরিহার করে চলতে হবে। কারও ব্যবহার পছন্দ না হলেও রাগ করা যাবে না বা কটু কথা বলা যাবে না, কারও মনে কষ্ট দেওয়া যাবে না। কারও দ্বারা যদি কারও কোনো ক্ষতি হয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে তার কাছ থেকে ক্ষমা চেয়ে নিতে হবে। সব সময় অজুর সঙ্গে থাকার চেষ্টা করতে হবে এবং মনে সব সময় আল্লাহর জিকির জারি রাখতে হবে। নিজের স্বার্থ আগে উদ্ধার করার মানসিকতা পরিহার করতে হবে। নিজের আগে অন্যকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো মানুষের হক নষ্ট করা যাবে না।


পৃথিবীর সব মানুষ একই পিতা–মাতার সন্তান। মানুষে মানুষে কোনো প্রকার ভেদাভেদ নেই, সাদাকালোয় কোনো প্রভেদ নেই। বর্ণবৈষম্য ও বংশকৌলীন্য—এগুলো মানুষের কৃত্রিম সৃষ্টি। পদ-পদবি ও অবস্থানগত পার্থক্য মানুষের মধ্যে অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে। হজের মাধ্যমে তা দূরীভূত হয়। হজকে মানবতার প্রশিক্ষণ বলা যায়। হজের ছয় দিন এই প্রশিক্ষণই হয়। জিলহজ মাসের ৭ তারিখে সব হাজি মিনার তাঁবুতে গণবিছানায় গিয়ে একাত্মতার ঘোষণা দেন। জিলহজের ৯ তারিখে হাজিরা আরাফাতের ময়দানে গিয়ে ঐক্যের অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেন; মিলিত হন আন্তর্জাতিক মহাসম্মেলনে। এদিন সন্ধ্যা (১০ জিলহজের রাতে) হাজিরা মুজদালিফায় গিয়ে সব কৃত্রিমতার অবসানের মাধ্যমে মানবতার পূর্ণতা ও আদি আসল প্রকৃত মানব রূপ লাভ করেন। সবার পদতলে মৃত্তিকা, মাথার ওপরে উন্মুক্ত আকাশ, সবার পরনে একই কাপড়। পোশাকে বাহুল্য নেই, খোলা মাথা-পাগড়ি–টুপি ও লম্বা চুলের আড়ম্বর নেই; সঙ্গে সেবক–কর্মচারী নেই, গন্তব্য এক হলেও রাস্তা জানা নেই, নিজের শক্তি-সামর্থ্য ও জ্ঞান–গরিমার প্রকাশ নেই, বুদ্ধি–বিবেচনা ও কৌশল প্রয়োগের সুযোগ নেই; শুধুই আল্লাহর ওপর ভরসা। এটিই হজের প্রকৃত উদ্দেশ্য ও আসল শিক্ষা।

প্রতীকী শয়তানকে পাথর মারা। পবিত্র কোরআনের সর্বশেষ সুরায় সর্বশেষ আয়াতে দুই প্রকার শয়তানের কথা উল্লেখ আছে, ‘এই দুই ভয় হলো জিন শয়তান ও মানুষ শয়তান।’ (সুরা-১১৩ নাস, আয়াত: ৬)। এ ছাড়া রয়েছে নফস শয়তান। ত্রিবিধ শয়তানের প্ররোচনা ও তাড়না থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং মনোজগতে শয়তানি শৃঙ্খলবন্ধন থেকে মুক্ত হওয়ার এবং সব ধরনের শয়তানি ভাব ও প্রভাব মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে একমাত্র বিবেকের অনুসরণে মহান রাব্বুল আলামিন আল্লাহ তাআলার ইবাদত তথা আনুগত্য করাই হলো শয়তানকে পাথর মারার মূল রহস্য।

কোরবানির মূল প্রতিপাদ্যই হলো প্রিয়তমের জন্য অন্য সবকিছু বিসর্জন দেওয়া। পশু কোরবানি একটি প্রতীক মাত্র। মনের মধ্যে যে পশুবৃত্তি বিদ্যমান, তাকে পরাভূত ও পরাজিত করাই হলো পশু জবাই বা পশু কোরবানির আনুষ্ঠানিক শিক্ষা। এর মাধ্যমে মনের সব কুপ্রবৃত্তিকে চিরতরে বিদায় করা এবং চরিত্রের সব কুস্বভাব পরিত্যাগ করাই মূল উদ্দেশ্য।

হজের সময় বর্ণ, শ্রেণি, দেশ, জাতি, মত, পথ ও পেশানির্বিশেষে সব দেশের সব মানুষ এক ইমামের পেছনে নামাজ আদায় করেন। এ হলো ‘ভিন্নমতসহ ঐক্য’–এর অনন্য দৃষ্টান্ত। বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ সহাবস্থান করেন বলে ভাষার দূরত্ব দূর হয়ে মনের নৈকট্য অর্জিত হয় এবং প্রকৃত মানবিক অনুভূতি জাগ্রত হয়। মনের সংকীর্ণতা দূর হয়, দৃষ্টিভঙ্গি প্রসারিত হয়, চিন্তার বিকাশ সাধিত হয়। যাঁরা হজের শিক্ষা লাভে ধন্য হন, তাঁরাই প্রকৃত হাজি। হজ ইবাদত, এটি কোনো সার্টিফিকেট কোর্স বা পদ–পদবি নয়। হজ করার পর নিজ থেকেই নামের সঙ্গে হাজি বিশেষণ যোগ করা সমীচীন নয়।

কবুল করার মালিক আল্লাহ। কিছু বাহ্যিক আলামত বা নিদর্শন রয়েছে, যাতে হজ কবুল হলো কি হলো না, তা সাধারণভাবে বোঝা যায়। যেমন হজের পরে কাজে–কর্মে, আমলে–আখলাকে, চিন্তাচেতনায় পরিশুদ্ধি অর্জন করা বা পূর্বাপেক্ষা উন্নতি লাভ করা। হজ করা বড় কথা নয়; জীবনব্যাপী হজ ধারণ করাই আসল সার্থকতা।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘হজ ও উমরাহর জন্য গমনকারী ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার বিশেষ মেহমান। তিনি দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। কবুল হজের মাধ্যমে মানুষ নিষ্পাপ হয়ে যায়।’ (মুসলিম, তিরমিজি, মিশকাত)। যাঁর হজ কবুল হবে, হজের পরও চল্লিশ দিন পর্যন্ত তাঁর 
দোয়া কবুল হবে; এমনকি যত দিন তিনি গুনাহে লিপ্ত না হবেন, তত দিন তাঁর সব দোয়া কবুল হতেই থাকবে। (মাজমুআয়ে উছমানী)।

শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী: বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতির যুগ্ম মহাসচিব ও আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজমের সহকারী অধ্যাপক
[email protected] 

সিলেট সমাচার
সিলেট সমাচার
এই বিভাগের আরো খবর