• শনিবার   ১৭ এপ্রিল ২০২১ ||

  • বৈশাখ ৪ ১৪২৮

  • || ০৪ রমজান ১৪৪২

সর্বশেষ:
লকডাউনের তৃতীয় দিনে ফাঁকা সিলেট নগরী করোনায় মৃত্যুর সব রেকর্ড ভেঙে দাঁড়াল ১০১ এ জুড়ী উপজেলা রমজানে সবজির বাজারে দাম ঊর্ধ্বমুখী রোববার উদ্বোধন হবে দেশের সবচেয়ে বড় করোনা হাসপাতাল করোনা: ওসমানীর ল্যাবে ২০ জন শনাক্ত যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুকধারীর হামলায় নিহত আট, আহত অনেক হবিগঞ্জে ভিজিডির ৬২ বস্তা চালসহ যুবক আটক কঠোর নজরদারিতে সিলেটে চলছে তৃতীয় দিনের লকডাউন

প্রত্যক্ষদর্শী ছাত্রের বর্ণনা, শফীর মৃত্যু নিয়ে কী ঘটেছিল? 

সিলেট সমাচার

প্রকাশিত: ২২ ডিসেম্বর ২০২০  

হেফাজতে ইসলামের সাবেক আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে ‘মানসিক নির্যাতন করে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে’—এমন অভিযোগ করে তার পরিবার। গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানী ঢাকার আজগর আলী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হেফাজতে ইসলামের সর্বোচ্চ নেতা ও চট্টগ্রামের হাটহাজারী আল-জামিয়াতুল আহলিয়া দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম (বড় মাদরাসা) মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা শাহ আহমদ শফী মারা যান।

তার মৃত্যুর দিন মাদ্রাসার অভ্যন্তরে সেদিন কী ঘটেছিল, তার বর্ণনা দিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শী মাদ্রাসার একজন শিক্ষার্থী। 

শহীদ শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রাহ. হাটহাজারীতে জীবনের শেষ তিনদিন নামের ৩২ পৃষ্ঠার একটি বইতে কীভাবে শফীর মৃত্যু হয় এবং মাদ্রাসার অভ্যন্তরে সেদিন আন্দোলনের নামে কী ঘটেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়েছে। 

ঘটনার সূত্রপাত
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০, বুধবার। অন্যদিনের মতোই শুরু হয়েছিল বুধবার দিনটি। সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফীও সুস্থ ও স্বাভাবিক ছিলেন। হজরতের ছেলে আনাস মাদানী ঢাকায় ছিলেন। 

হুজুরকে দারুল হাদিসে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুকি নেওয়া হচ্ছিল। ঠিক ওই সময়ে (জোহরের নামাজের পর) মাঠে হৈ চৈ এর আওয়াজ শুনতে পেয়ে একজন শিক্ষক হজরতের কামরায় এসে খবর দেন, ছাত্ররা মাঠে চিৎকার করছে, আনাস মাদনীর বহিস্কারের দাবি জানাচ্ছে।  

কিছুক্ষণ পর খবর আসে, হজরতের ছেলে আনাস মাদনীর কক্ষের দরজা-জানালা ভেঙে লুটপাট করছে সন্ত্রাসীরা। তার কিছুক্ষণ পর আন্দোলন কারী সন্ত্রাসীরা  হাটতাজারী মাদ্রাসার মুঈনে মুহতামিম আল্লামা শেখ আহমদ সাহেবের কক্ষের দরজা ভেঙ্গে হুজুরকে ধরে মুহতামিম সাহেবের কামরায় আসতে বাধ্য করে। 

শেখ আহমদ সাহেবের সঙ্গে জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের সক্রিয় নেতা হাসানুজ্জামানের নেতৃত্বে পাঁচজনের একটি দল শফী সাহেবের কার্যালয়ে আছে। কার্যালয় প্রবেশ করতেই হযরতকে তারা অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকে এবং আনাস মাদানীকে বহিষ্কার করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। তখন শফী হুজুর বলেন, আনাসের যেসব দোষ রয়েছে, তা লিখিত আকারে অভিযোগ করে জানাও, আমি দস্তখত দিব। 
দলের সদস্যরা প্রমাণসহ সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ উপস্থাপন করতে না পারায় আল্লামা আহমদ শফী সাহেব চুপ করে থাকেন। 

এক পর্যায়ে জবসদস্তি ও অনন্যোপায় হজরতের পক্ষ থেকে স্বাক্ষর আদায়ে সক্ষম হয় তারা। তাবে সাক্ষরটি যে হজরতের হাতে দেওয়া স্বাক্ষর না, সেটা দেখলেই বুঝা যায়। এরপর তারা মাদ্রাসার মাঠে গিয়ে মাইকে হুজুর আনাস মাদানীকে বহিস্কার করেছেন, আগামী শনিবার শুরার সভায় বাকি বিষয়ে সমাধান হবে বলে ঘোষণা দেয়। থমথমে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
 
১৭ সেপ্টেম্বর সকাল ১০ টায় মাদ্রাসার কয়েকজন শিক্ষক আল্লামা শাহ আহমদ শফীর কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাত করতে আসেন। সন্ত্রাসীরা এই সাধারণ বিষয়টিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নানাভাবে গুজব প্রচার করতে থাকে- শফী সাহেব মাদ্রাসা বন্ধ করে দেওয়ার জন্য মিটিং ডেকেছেন। তিনি গতকালের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন। 

এ সময় কোনো অজুহাত ছাড়া হজরতের সামনে তার খাদেমদের বেধড়ক মারধর করা হয় এবং হজরতকে সামনাসামনি হুমকি ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে সন্ত্রাসীরা। তারা হজরতের অক্সিজের সাপোর্ট খুলে ফেলে। খাদেম ও নাতিরা হজরতকে অক্সিজের সাপোর্ট দিতে গেলে তাদের বাধা দেয়া হয়। 

আসরের নামাজের পর নাতি আরশাদকে বলা হয়, আপনাকে হুজুর সুস্থ আছেন, হামলা হয়নি এ মর্মে ভিডিওবার্তা দিতে হবে। আরশাদ ভিডিওবার্তা দিতে অস্বীকার করলে তাকে হত্যার হুমকি দেয়া হয়। অবশেষে খাদেম হজরতের কক্ষে হামলা হয়নি বলে ভিডিওবার্তা দেয়। 

মাগরিবের পর সন্ত্রাসীরা শুরু সদস্যদের ডেকে এনে বৈঠকের ব্যবস্থা করে। শুরু সদস্যরা হুজুরের কামরায় আসতে থাকেন। সন্ধ্যায় সাতটা-আটটার দিকে মজলিশে শুরার বৈঠক শুরু হয়। বৈঠক শুরু হওয়ার কয়েক মিনিট পরই হজরত অনুস্থ হয়ে পড়েন। ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসীরা হুজুরকে সারাদিন কোনো ওষুধ বা খাবার খাওয়াতে দেয়নি। দুই দিনের মানসিক নির্যাতনে, কার্যালয় ভাংচুর, খাবার ও ওষুধ না পেয়ে হজরত পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পড়েন। 

তখন নাতি আরশাদসহ খাদেমরা বলেন, দাদুর অবস্থা বেশি খারাপ। আপনারা যা ইচ্ছে করেন, প্রয়োজনে তার পদত্যাগের ঘোষণা দেন। 

তখন তারা ঘোষণা দেয়, হুজুর পদত্যাগ করেছেন। কিন্তু হজরত আসলে এ ব্যাপারে কিছু বলার মতো অবস্থায় ছিলেন না। কোনো দস্তকথ করার তো প্রশ্নই উঠে না। দস্তখত করার আগেই তিনি চোখ বন্ধ করে ফেলেন। 

শেষ পর্যন্ত পুলিশি পাহারায় অ্যাম্বুলেন্স চট্টগ্রাম মেডিজেল কলেজ হাসপাতালে পৌঁছে। হাসপাতালে নেওয়ার পর কর্তব্যরত চিকিৎসকগণ শফীকে দেখে নাতি আরশাদকে রাগতস্বরে বলেন, আপনারা হুজুরকে এখন কেন নিয়ে এসেছেন? অক্সিজের না থাকার কারণে হুজুরের যে ক্ষতি হয়েছে, তা আমাদের পক্ষে চিকিৎসা দ্বারা পূরণ করা সম্ভব নয়। আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন। রাত ১টা ৩০ মিনিটে শফীকে চমেক হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসা চলতে থাকে। পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর শুক্রবার দুপুর ১২টায় ডাক্তারগণ বোর্ড মিটিংয়ে বসেন। তারা নাতি আরশাদকে জানান, আমাদের চেষ্টা ব্যর্থ। আপনারা উনাকে অন্যত্র নিয়ে চেষ্টা করুন। 

শুক্রবার বিকাল সোয়া ৪টায় এরার অ্যাম্বুলেন্সে করে পুরান ঢাকার আসগর আলী হাসপাতালের উদ্দেশে রওয়া হয়। সন্ধ্যা ৬টার আগেই ঢাকায় পৌছে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স এবং শফীকে আসগর আলী হাসপাতালে জরুরী বিভাগে ভর্তি করা হলে কিছুক্ষণ তিনি ইন্তেকাল করেন।

 


 

সিলেট সমাচার
সিলেট সমাচার